নিম্ন আয়ের মানুষের পুষ্টি ঘাটতি মেটাতে দেয়া হবে পুষ্টি চাল

0
1

বাংলারজয় প্রতিবেদক :

দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের দেহে পুষ্টি ঘাটতির সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই লক্ষ্যে আগামী ’২৫ সালের মধ্যে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীর অধীনে সারাদেশে পুষ্টিচাল বিতরণ করা হবে। পর্যায়ক্রমে সারাদেশে খাদ্য বিতরণের সরকারী সব ধরনের কর্মসূচীতে পুষ্টিচাল বিতরণ নিশ্চিত করা হবে। এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ‘পুষ্টিচাল উৎপাদন, বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক নির্দেশিকা-২০২১’ প্রণয়ন করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

এ ব্যাপারে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার জনকণ্ঠকে বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষের পুষ্টির ঘাটতি মেটাতে আগামীতে সরকারী সকল ধরনের কর্মসূচীতে পুষ্টিচাল বিতরণ করা হবে। এতে নিম্ন আয়ের মানুষের দেশে ছয়টি ভিটামিনের ঘাটতি পূরণ হবে। তিনি বলেন, দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ ভাতের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ভাতের পাশাপাশি এরা অন্যান্য ভিটামিন যুক্ত খাবার গ্রহণ করতে পারেন না। এতে এই শ্রেণীর অধিকাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভোগেন। সরকারী বিভিন্ন কর্মসূচীতে পুষ্টিচাল প্রদান করতে তারা আর অপুষ্টিতে ভুগবেন না। দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের কথা বিবেচনায় আমরা পরিকল্পিতভাবে পুষ্টিচাল বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছি।

মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, গবেষণামূলক এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের মানুষের দেহে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি১, ভিটামিন-বি১২, ভিটামিন-বি৯ (ফলিক এসিড), আয়রন এবং জিঙ্ক এই ছয়টি পুষ্টি ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশু-কিশোরদের ভেতর এ সমস্যা বেশি। ভাত এ দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য। তাই চাল যদি পুষ্টিসমৃদ্ধ করা যায়, তাহলে সব শ্রেণীর মানুষের পুষ্টি ঘাটতি দূর করা সহজ হবে।

সেজন্য সরকার প্রাথমিকভাবে খাদ্যশস্যভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের অন্তর্ভুক্ত সরকারী কর্মসূচীর মাধ্যমে দরিদ্র জনগণের পুষ্টি ঘাটতি মেটানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। হতদরিদ্রদের ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির খাদ্যবান্ধব কর্মসূচী, ভিজিডি কর্মসূচী ও স্কুল মিল কর্মসূচীতে স্বল্প পরিসরে পুষ্টিচাল বিতরণ করা হচ্ছে।

সাধারণ চালের সঙ্গে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি১, ভিটামিন-বি১২, ভিটামিন-বি৯ (ফলিক এসিড), আয়রন এবং জিঙ্ক এই ছয়টি পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ দানাদার চাল বা কার্নেল উৎপাদন করা হয়। পরে সাধারণ চালের সঙ্গে ১০০:১ অনুপাতে কার্নেল মিশিয়ে পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল (ফর্টিফায়েড রাইস) প্রস্তুত করা হয়। প্রতি ১০০টি সাধারণ চালের সঙ্গে একটি পুষ্টিচাল অর্থাৎ ১০০ কেজিতে এক কেজি হারে পুষ্টিচাল মেশানো হয়। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গড় করে দেয় মিশ্রণ মেশিন। এ চালের মাধ্যমে পুষ্টি চাহিদা পূরণ হয়, কিন্তু চালের স্বাদের কোন পরিবর্তন হয় না।

দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণে বিশ্বখাদ্য কর্মসূচীর কারিগরি সহযোগিতায় ২০১৩ সালের জুন মাসে প্রথমবার কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার ভিজিডি কর্মসূচীর উপকারভোগী নারীদের মধ্যে পাইলট প্রোগ্রাম হিসেবে পুষ্টিচাল বিতরণ কার্যক্রম শুরু করে মহিলাবিষয়ক অধিদফতর। অন্যদিকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীর আওতায় কুড়িগ্রামের সদর ও ফুলবাড়ী উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে পুষ্টিচাল বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা হয়। এখনও পুষ্টিচাল বিতরণ কার্যক্রম সেভাবে বিস্তৃতি লাভ করেনি।

খাদ্য অধিদফতর খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীর আওতায় মার্চ ও এপ্রিল এবং সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নবেম্বর এই পাঁচ মাস ৫০ লাখ হতদরিদ্র পরিবারকে ১০ টাকা কেজি দরে প্রতি মাসে ৩০ কেজি হারে চাল দিয়ে থাকে। এ বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সংগ্রহ ও সরবরাহ অনুবিভাগ) খাজা আব্দুল হান্নান বলেন, পুষ্টিচাল দেয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, যেসব মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে, আমরা যদি চালের মধ্যে ছয়টি খাদ্য উপাদান দিতে পারি, তবে পুষ্টির ঘাটতি সহজেই দূর হবে।

খাজা আব্দুল হান্নান জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা চাই পরিকল্পিতভাবে যেন পুষ্টিচাল বিতরণ করা হয়। সেজন্য নির্দেশিকাটি করা হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা এক সময় সারাদেশের সব চালই পুষ্টিচাল হবে। মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হলেই তখন চাহিদা বাড়বে। তখন বেসরকারী উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসবেন। এ নির্দেশিকা সেই বিষয়ে কাজ করতে সহায়তা করবে।

তিনি বলেন, কার্নেল ফ্যাক্টরি, মিক্সিং মিল এগুলো যেন সঠিকভাবে দেশের সব এলাকায় হয়। একই সঙ্গে এ বিষয়ে পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শনের জন্য এ নির্দেশিকাটি করা হয়েছে। পুষ্টিচাল বিতরণে যেখানে প্রয়োজন সেখানে যেন কারখানা ও মিল হয়, সমন্বয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করবে এ নির্দেশিকা।

আগামী বছর থেকে প্রতিবছর ১০০টি উপজেলায় পুষ্টিচাল বিতরণের কর্মসূচী সম্প্রসারণ হবে। ২০২৫ সালের মধ্যে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীর অধীনে দেশের সব উপজেলায় পুষ্টিচাল দেয়া হবে। পর্যায়ক্রমে সরকারী খাদ্য বিতরণের অন্যান্য কর্মসূচীতে শতভাগ স্থানে পুষ্টিচাল বিতরণ নিশ্চিত করা হবে। সেই লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে নির্দেশিকায়।

নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, সরকারের কর্মসূচীগুলোতে পুষ্টিচাল বিতরণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি এ চাল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মিশ্রণ মিল ও কার্নেল ফ্যাক্টরির সংখ্যাও বেসরকারী খাতে ধীরে ধীরে বাড়ছে। সরকারীভাবে খাদ্য মন্ত্রণালয়ও পুষ্টিচাল টেস্টিং সুবিধাদিসহ একটি কার্নেল ফ্যাক্টরি নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

এতে আরও বলা হয়, বর্তমানে সরকারী কর্মসূচীগুলোতে পুষ্টিচাল বিতরণের জন্য পৃথক পৃথক নীতিমালা ও পরিপত্র রয়েছে। কিন্তু সার্বিকভাবে পুষ্টিচাল উৎপাদন প্রক্রিয়া ও বিতরণ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সমন্বিত কোন নির্দেশিকা নেই। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করে ‘পুষ্টিচাল উৎপাদন, বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক নির্দেশিকা’ প্রণয়ন করা হলো।

নির্দেশিকার পুষ্টিচাল সম্প্রসারণ কার্যক্রম পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীতে ২০২২ সাল থেকে প্রতি বছর ১০০টি করে উপজেলা বৃদ্ধির মাধ্যমে ২০২৫ সালে দেশের সব উপজেলায় পুষ্টিচাল বিতরণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করার লক্ষ্যে খাদ্য অধিদফতর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। এছাড়া ওএমএস/ভিজিডি/স্কুল মিল বা অন্য কোন কর্মসূচীর অধীন পুষ্টিচাল কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য মন্ত্রণালয়গুলো বছরভিত্তিক পুষ্টিচালের চাহিদা নিরূপণ করে অর্থবছর শুরুর আগেই ৩০ জুনের মধ্যে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে জানাবে। প্রতিবছর ১০০টি করে উপজেলা বৃদ্ধিতে চাহিদা অনুযায়ী কার্নেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here