পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জিয়ার গুলি চালানোর নজির নেই : প্রধানমন্ত্রী

0
1

বাংলারজয় প্রতিবেদক :

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জিয়াউর রহমান সেক্টর কমান্ডার ছিল, কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কখনো গুলি চালিয়েছে এ রকম কোনো নজির নেই। গতকাল রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ছাত্রলীগ আয়োজিত জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পঁচাত্তরের পরে যারা সংবিধান লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করে, সেখানে আমাদের দলেরও কিছু বেইমান-মোনাফেক-মীরজাফর ছিল। যেমন খন্দকার মোশতাক গং। আর তার শক্তিটা ছিল জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে একটা সেক্টর কমান্ডার অর্থাৎ সেখানে খালেদ মোশাররফ আহত হলে জিয়াকে সেক্টর কমান্ডার করা হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জিয়াউর রহমান কখনো গুলি চালিয়েছে- এ রকম নজির নেই। এ রকম কোনো নজির কেউ দেখাতে পারবে না। তিনি বলেন, মোশতাক বা রশীদ-ফারুক বিবিসিতে যে ইন্টারভিউ দিয়েছে ১৫ আগস্টের পর, সেই ইন্টারভিউতে তারা স্বীকার করেছে। শুধু তাই না, অনেক পত্রিকায়ও তাদের বক্তব্য এসেছে যে, জিয়াউর রহমান এই খুনিদের সঙ্গে সব সময় ছিল এবং জিয়াউর রহমানই ছিল মূল শক্তির উৎস। সে-ই বেইমানিটা করেছিল। অথচ জিয়াউর রহমান ছিল একটা মেজর।

স্বাধীনতার পর মাত্র তিন বছরের মধ্যে মেজর থেকে একটা প্রমোশন দিয়ে মেজর জেনারেল করা হয়েছিল। সেটা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। সমস্ত সেনাবাহিনী যখন তিনি পুনর্গঠন করেন। সরকারপ্রধান বলেন, কাজেই সেটাও তাদের ভোলা উচিত না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বদৌলতেই জিয়াউর রহমান মেজর থেকে মেজর জেনারেল হয়েছিল। পাকিস্তান দেশটা থাকলে ওই মেজর হিসেবেই তার রিটায়ার্ড করতে হতো। তার ওপরে আর উঠতে পারত কি না সন্দেহ। কিন্তু সেই বেইমানি-মোনাফেকি তারা করেছিল। তখন যে ভূমিকা নেওয়ার কথা ছিল কেউ নেয়নি। জাতির পিতার লাশ, সকলের লাশ ১৬ তারিখ পর্যন্ত ওই ৩২ নম্বরের বাড়িতেই ছিল। কাফন-দাফনের ব্যবস্থাটুকু পর্যন্ত করা হয়নি। শেখ হাসিনা বলেন, এখনো যুদ্ধাপরাধী, পরাজিত শক্তি এবং ১৫ আগস্টের খুনি, যাদের ফাঁসি হয়েছে তারা তো বটেই, তাদের ছেলেপেলে, দোসর বা বংশধর, তারা এখনো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে, ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। যেসব আন্তর্জাতিক শক্তি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বিরোধিতা করেছিল, তাদের কিছু কিছু এদের মদদ দিয়ে থাকে।

কাজেই এ ব্যাপারে জাতিকে সতর্ক থাকতে হবে। শেখ হাসিনা দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, আমাদের পায়ে পায়ে শত্রু আছে, পদে পদে বাধা আছে। আমাদের চলার পথ মসৃণ না, কণ্টকাকীর্ণ। আমাদের চরাই-উৎরাই পার হয়ে এগিয়ে যেতে হবে এবং আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই সময় যারা স্থানীয় দালাল চক্র, যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর, তারা কোনো দিন চায়নি বাংলাদেশ স্বাধীন হোক। তারপরও যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, বিজয় অর্জন করল, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরাজিত হলো, তখন সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতেই ১৫ আগস্ট এই হত্যাকান্ড তারা চালিয়েছিল। এর পরে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নামটা সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়েছিল। তিনি বলেন, জয় বাংলা স্লোগান। যে স্লোগান দিয়ে লাখো শহীদ রক্ত দিয়েছেন, সেই স্লোগান নিষিদ্ধ করল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের সব কিছু ধ্বংস করা হয়েছিল। ভাবখানা এমন হয়েছিল যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। আবার সেই পাকিস্তানের একটা প্রদেশ হিসেবে বাংলাদেশ যেন সৃষ্ট হয় এবং সেই পাকিস্তান এসে আবার আমাদের ওপর খবরদারি করবে- অনেকের এমন আকাক্সক্ষা ছিল। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধ যারা করেছে সেই মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের হত্যা করা, হাজার হাজার সেনাবাহিনীর সদস্যকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এমন এমন রাত গেছে যে জোড়ায় জোড়ায় ফাঁসি হয়েছে। ১০ জন, ২০ জন- এ রকম করে একেক রাতে ফাঁসি, শত শত লোককে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। কে দিয়েছে? জিয়াউর রহমান দিয়েছে। শুধু ঢাকা জেলে না, খুলনা, রাজশাহী বিভিন্ন জায়গায় এই হত্যাকান্ড সে চালিয়েছে।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মেধাবী ছাত্র, তাদের হাতে একদিকে যেমন মেধার জন্য পুরস্কার তুলে দিয়েছে, অপরদিকে অস্ত্র তুলে দিয়েছে, অর্থ তুলে দিয়েছে, মাদক তুলে দিয়েছে এবং তাদের ব্যবহার করেছে। তাদের বিপথে নিয়ে গেছে। এ রকম বহু মেধাবী ছাত্রকে জিয়াউর রহমান বিপথে ঠেলে দিয়েছে। প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি। শিক্ষার কোনো পরিবেশ ছিল না। তার স্ত্রী খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় আসে তখনও সে হুমকি দিয়েছিল যে, আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করতে তার ছাত্রদলই নাকি যথেষ্ট। তার কারণ ছাত্রদলের হাতে তারা অস্ত্র তুলে দিয়েছে। তাদের লেখাপড়া করতে উৎসাহিত করেনি। তিনি বলেন, আমি ছাত্রলীগের হাতে খাতা-কলম তুলে দিয়েছিলাম। লেখাপড়া শিখতে হবে। ছাত্রলীগের মূলমন্ত্র শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি- এই আদর্শ নিয়ে ছাত্রলীগকে তৈরি হতে হবে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে হবে।

মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু ক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান, এরপরে এরশাদ, তারপরে খালেদা জিয়া- তারা কী করেছে? তারা ছাত্রসমাজকে ধ্বংস করতে চেয়েছে। সুশিক্ষায় শিক্ষিত হোক এই জাতি, এটা তারা কখনো চায়নি। অবশ্য চাইবেই বা কী করে, নিজেদের কী অবস্থা সেটাও তো দেখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই বাংলাদেশে ১৫ আগস্টের যে হত্যাকান্ড ঘটে গেছে, এরপরে একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা। এ ছাড়াও বহুবার আমার ওপরে হামলা। এমন কি চুয়াত্তর সালে কামালের ওপর হামলা হলো। তাকেও গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হলো। যখন দেখল সে বেঁচে গেছে, তখন তার বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া হলো। মিথ্যা অপবাদ ছড়ানো হলো। অর্থাৎ যারা পরাজিত শক্তি তারা সব সময় সক্রিয় ছিল। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্রদের ভূমিকা রয়েছে। আজকে বাংলাদেশের প্রতিটি অর্জন। সেই মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন বা মিলিটারি ডিক্টেটরশিপের বিরুদ্ধে আন্দোলন বা যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সব সময় ছাত্ররাই করেছে। ছাত্ররাই সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। এ ধরনের বাধা-বিঘ্ন আসতে থাকবে। সৎ পথে থাকলে, সত্যের পথ সব সময় কঠিন হয়, সে কঠিন পথকে যারা ভালোবেসে এগিয়ে যেতে পারে, তারাই সাফল্য আনতে পারে।

ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সেই শিক্ষা শান্তি প্রগতি- এই আদর্শ নিয়েই ছাত্রলীগকে তৈরি হতে হবে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে হবে। মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। সভায় সভাপতিত্ব করেন ছাত্রলীগ সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়। সভা পরিচালনা করেন ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং আবদুর রহমান। ছাত্রলীগের সাবেক শীর্ষ নেতাদের মধ্যে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, বি এম মোজাম্মেল হক, মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী, এনামুল হক শামীম, লিয়াকত সিকদার, শাহজাদা মহিউদ্দিন, বলরাম পোদ্দার, মাহমুদ হাসান রিপন, মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন, সাইফুর রহমান সোহাগ, এস এম জাকির হোসাইন প্রমুখ। সভার শুরুতে ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের নিহত সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে ছাত্রলীগের প্রকাশনা পত্রিকা ‘মাতৃভূমি এবং জয় বাংলা’ ম্যাগাজিনের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here