‘বাংলার জনগণের এক নম্বর কাজ দুর্নীতিবাজদের উৎখাত করা’

0
0

বাংলারজয় প্রতিবেদক :

স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিবছরের ২৬ মার্চ দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দিতেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকদের হাতে সপরিবারে প্রাণ হারানোর আগে ২৬ মার্চ দেয়া ভাষণে জাতির পিতা ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’র ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেজন্য ওই ভাষণকে দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক ছিল সন্ত্রাসী, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, মুনাফাখোর ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে। সে সময় জাতির পিতা শিক্ষকদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনুন, রাজনীতি একটু কম করুন।’ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, সরকারি কর্মচারী ভাইরা একটু ডিসিপ্লিনে এসে অফিসে যান, কাজ করেন। দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে হবে। আমি আপনাদের সাহায্য চাই। আপনাদের দুর্গ গড়তে হবে। সে দুর্গ গড়তে হবে দুর্নীতিবাজদের খতম করার জন্য।’

আপনার মাইনে দেয় ঐ গরিব শ্রমিক। আপনার সংসার চলে ঐ টাকায়। আমরা গাড়ি চড়ি ঐ টাকায়। ওদের সম্মান করে কথা বলুন। ইজ্জত করে কথা বলুন। ওরাই মালিক, ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চলে

১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় দ্বিতীয় বিপ্লবের এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু। বিভিন্ন সময়ে দেয়া বঙ্গবন্ধুর ১৩০টি ভাষণ বিশ্লেষণ করে এটি পাওয়া যায়। সংসদের লাইব্রেরিতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা আছে।

বঙ্গবন্ধু তার ভাষণটি শুরু করেন এভাবে, ‘আমার ভাই ও বোনেরা, আজ ২৬ মার্চ ১৯৭৫ সাল। ’৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলার মানুষকে আক্রমণ করেছিল। হাজার হাজার লাখ লাখ লোককে হত্যা করেছিল। সেদিন রাতে বিডিআর ক্যাম্পে, পুলিশ ক্যাম্পে, আমার বাড়িতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং চারদিকে আক্রমণ চালায় ও নিরস্ত্র মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাশবিক শক্তি নিয়ে। বাংলার মানুষকে আমি ডাক দিয়েছিলাম; ৭ মার্চ আমি তাদের প্রস্তুত করে দিয়েছিলাম। যখন দেখলাম আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে, সেই মুহূর্তে আমি আবার ডাক দিয়েছিলাম যে আর নয়, মোকাবিলা করবো। বাংলার মানুষ যে যেখানে আছে, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুদের মোকাবিলা করব। বাংলার মাটি থেকে শত্রুকে উৎখাত করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীন করতে হবে। বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। দুনিয়ার মানুষের কাছে আমি সাহায্য চেয়েছিলাম। আমার সামরিক বাহিনীতে যারা বাঙালি ছিল, আমার বিডিআর, আমার পুলিশ, আমার ছাত্র-যুবক ও কৃষকদের আমি আহ্বান করেছিলাম। বাংলার মানুষ রক্ত দিয়ে মোকাবিলা করেছিল।’

জাতির পিতা বলেন, ‘৩০ লাখ লোক শহীদ হয়েছিল। লাখ লাখ মা-বোন ইজ্জত হারিয়েছিল। শত শত বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল। দুনিয়ার জঘন্যতম ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল পাকিস্তানি শাসক শ্ৰেণি। দুনিয়ার ইতিহাসে এত রক্ত স্বাধীনতার জন্য কোনো দেশ দেয় নাই, যা বাংলার মানুষ দিয়েছে। শুধু তাই নয়, তারা (পাকিস্তানি) এমনভাবে পরিকল্পনা শুরু করল, যা কিছু ছিল ধ্বংস করতে আরম্ভ করে দিল। ভারতে আমার ১ কোটি লোক আশ্রয় নিয়েছিল; তার জন্য আমরা নিশ্চয়ই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করব।’

এসময় বঙ্গবন্ধু তার বক্তৃতায় স্বাধীনতা পরবর্তী দেশের অবস্থা তুলে ধরেন। তুলে ধরেন পাকিস্তানিদের ধ্বংসলীলার চিত্রও।

পাকিস্তান সব নিয়ে গিয়েছে কিন্তু এই চোরদের তারা নিয়ে গেলে বাঁচতাম। এই চোর রেখে গিয়েছে। কিছু দালাল গিয়েছে, চোর গেলে বেঁচে যেতাম

জাতির পিতা বলেন, ‘এক কোটি লোককে ঘরবাড়ি দিয়েছি। রাষ্ট্রের লোককে খাওয়ানোর জন্য বিদেশ থেকে খাবার আনতে হয়েছে। পোর্টগুলো অচল থেকে সচল হয়েছে। দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গা থেকে ২২ কোটি মণ খাবার এনে বাংলার গ্রামে গ্রামে নিয়ে বাংলার মানুষকে বাঁচাতে হয়েছে। তাই আজ কথা হচ্ছে- আমি মানুষকে বললাম, আমার ভাইদের বললাম, মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের বললাম, তোমাদের অস্ত্র জমা দাও। তারা অস্ত্র জমা দিল। কিন্তু একদল লোক আমার জানা আছে, যাদের পাকিস্তান অস্ত্র দিয়ে গিয়েছিল তারা অস্ত্র জমা দেয়নি। তারা এসব অস্ত্র দিয়ে নিরপরাধ লোককে হত্যা করতে শুরু করল। এমনকি পাঁচজন পার্লামেন্টের সদস্যকেও তারা হত্যা করল।’

তিনি বলেন, ‘সিস্টেম পরিবর্তন করেছি। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবার জন্য কথা হলো, এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যে, অফিসে যেয়ে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে যায়, সাইন করিয়ে নেয়, ফ্রি স্টাইল। ফ্যাক্টরিতে যেয়ে কাজ না করে টাকা দাবি করে। সাইন করিয়ে নেয়। যেন দেশে সরকার নাই। স্লোগান হলো- বঙ্গবন্ধু কঠোর হও। বঙ্গবন্ধু কঠোর হবে কঠোর ছিল, আছে। কিন্তু দেখলাম, চেষ্টা করলাম। এত রক্ত এত বাধা দুঃখ- দেখি কি হয় পারি কিনা, আবদার করলাম। দুঃখে আবেদন করলাম, অনুরোধ করলাম, রিকোয়েস্ট করলাম, কামনা করলাম। চোর নাহি শুনে ধর্মের কাহিনি।’

‘ভাইয়েরা, বোনেরা আমার! আজকে যে সিস্টেম করেছি তার আগেও ক্ষমতা বঙ্গবন্ধুর কম ছিল না। আমি বিশ্বাস করি না ক্ষমতা বন্দুকের নলে। আমি বিশ্বাস করি, ক্ষমতা বাংলার জনগণের কাছে। জনগণ যেদিন বলবে, বঙ্গবন্ধু ছেড়ে দাও, একদিনও রাষ্ট্রপতি, একদিনও প্রধানমন্ত্রী থাকব না।’

শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আজ কে দুর্নীতিবাজ? যে ব্ল্যাকমার্কেটিং করে সে দুর্নীতিবাজ। যারা কর্তব্য পালন করে না তারা দুর্নীতিবাজ। যারা বিবেকের বিরুদ্ধে কাজ করে তারাও দুর্নীতিবাজ। যারা বিদেশের কাছে দেশকে বিক্রি করে তারাও দুর্নীতিবাজ। এই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম শুরু করতে হবে। আমি কেন ডাক দিয়েছি? এই ঘুণে ধরা ইংরেজ আমলের, পাকিস্তানি আমলের যে শাসন ব্যবস্থা তা চলতে পারে না। একে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। তাহলে দেশের মঙ্গল আসতে পারে। আমি তিন বছর দেখেছি। দেখেশুনে আমি আমার স্থির বিশ্বাসে পৌঁছেছি এবং তাই জনগণকে পৌঁছিয়ে দিতে হবে শাসনতন্ত্রের মর্মকথা। আজকে জানি, আপনাদের কষ্ট হচ্ছে। আমি জানি, না খেয়ে কষ্ট পাচ্ছেন। আমার চেয়ে অধিক কে জানতে পারে? বাংলার কোন থানা আমি ঘুরি নাই? বাংলার কোন জায়গায় আমি যাই নাই? বাংলার মানুষকে আমার মতো কে ভালো করে জানে? আপনারা দুঃখ পান, না খেতে পাচ্ছেন, আপনাদের গায়ে কাপড় নাই, আপনাদের শিক্ষা দিতে পারছি না। কিন্তু সবচেয়ে বড় জিনিস খাদ্য। একটা কথা বলি আপনাদের কাছে, সরকারি আইন করে কোনো দিন দুর্নীতিবাজদের দমন করা সম্ভব নয় জনগণের সমর্থন ছাড়া। আজকে আমার একমাত্র অনুরোধ আপনাদের কাছে, সেটা হলো এই, আমি বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে জেহাদ করতে হবে, যুদ্ধ করতে হবে শত্রুর বিরুদ্ধে। আজকে আমি বলব, বাংলার জনগণের এক নম্বর কাজ হবে, দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে হবে। আমি আপনাদের সাহায্য চাই। কেমন করে করতে হবে। আইন চালাব, ক্ষমা করব না। যাকে পাব ছাড়ব না। একটা কাজ আপনাদের করতে হবে। গণআন্দোলন করতে হবে। আমি গ্রামে গ্রামে নামব। এমন আন্দোলন করতে হবে, যে ঘুষখোর, যে দুর্নীতিবাজ, যে মুনাফাখোর, যে আমার জিনিস বিদেশে চোরাচালান দেয় তাদের সামাজিক বয়কট করতে হবে। গ্রামে গ্রামে মিটিং করে দেখাতে হবে, চোর, ঐ ব্ল্যাকমার্কেটিয়ার, ঐ ঘুষখোর। ভয় নাই, কোনো ভয় নাই, আমি ঐ আছি। ইনশাআল্লাহ আপনাদের উপর অত্যাচার করতে দেব না।’

তিনি বলেন, ‘আপনাদের গ্রামে গ্রামে আন্দোলন করতে হবে। আন্দোলন করতে পারে কে? ছাত্র ভাইরা পারে। পারে কে? যুবক ভাইরা পারে। পারে কে? বুদ্ধিজীবীরা পারে। পারে কে? জনগণ পারে। আপনারা সংঘবদ্ধ হন। ঘরে ঘরে। আপনাদের দুর্গ গড়তে হবে। সে দুর্গ গড়তে হবে দুর্নীতিবাজদের খতম করার জন্য। বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের দুঃখ মোচন করার জন্য। এই দুর্নীতিবাজদের যদি খতম করতে পারেন তাহলে বাংলাদেশের মানুষের শতকরা ২৫ থেকে ৩০ ভাগ দুঃখ চলে যাবে। এত চোর, এই চোর যে কোথা থেকে পয়দা হয়েছে তা জানি না। পাকিস্তান সব নিয়ে গিয়েছে কিন্তু এই চোরদের তারা নিয়ে গেলে বাঁচতাম। এই চোর রেখে গিয়েছে। কিছু দালাল গিয়েছে, চোর গেলে বেঁচে যেতাম।’

‘দ্বিতীয় কথা, আপনারা জানেন, আমার দেশের এক একর জমিতে যে ফসল হয় জাপানের এক একর জমিতে তার তিনগুণ বেশি ফসল হয়। কিন্তু আমার জমি দুনিয়ার সেরা জমি। আমি কেন সেই জমিতে ডবল ফসল করতে পারব না, দ্বিগুণ করতে পারব না? আমি যদি দ্বিগুণ করতে পারি তাহলে আমাকে খাদ্য কিনতে হবে না। ভিক্ষা করতে হবে না। ভিক্ষুক জাতির ইজ্জত নাই। একটা লোককে আপনারা ভিক্ষা দেন এক টাকা বা আট আনা। তারপর তার দিকে কীভাবে চান বলেন, ও বেটা ভিক্ষুক, যা বেটা, নিয়ে যা আট আনা পয়সা।’

jagonews24

বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘একটা জাতি যখন ভিক্ষুক হয়, মানুষের কাছে হাত পাতে, আমারে খাবার দাও, আমারে টাকা দাও সেই জাতির ইজ্জত থাকতে পারে না। আমি সেই ভিক্ষুক জাতির নেতা থাকতে চাই না। আমি চাই বাংলাদেশের প্রত্যেক কৃষক ভাইয়ের কাছে যারা সত্যিকার কাজ করে, যারা প্যান্ট পরা কাপড় পরা ভদ্রলোক তাদের কাছেও চাই জমিতে যেতে হবে, ডবল ফসল করুন। প্রতিজ্ঞা করুন, আজ থেকে ঐ শহীদদের কথা স্মরণ করে ডবল ফসল করতে হবে। যদি ডবল ফসল করতে পারি, আমাদের অভাব ইনশাআল্লাহ হবে না। ভিক্ষুকের মতো হাত পাততে হবে না।’

সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনার মাইনে দেয় ঐ গরিব শ্রমিক। আপনার সংসার চলে ঐ টাকায়। আমরা গাড়ি চড়ি ঐ টাকায়। ওদের সম্মান করে কথা বলুন। ইজ্জত করে কথা বলুন। ওরাই মালিক, ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চলে। সরকারি কর্মচারীদের বলি, মনে রেখো এটা স্বাধীন দেশ। এটা ব্রিটিশের কলোনি নয়, পাকিস্তানের কলোনি নয়। যে লোককে দেখবে তার চেহারাটা তোমার বাবার মতো, তোমার ভাইয়ের মতো, ওরাই সম্মান বেশি পাবে। কারণ ওরা নিজেই কামাই করে খায়। একটা কথা আমি জিজ্ঞাসা করি। কিছু মনে করবেন না, আমাদের লেখাপড়া শিখিয়েছে কে? ডাক্তারি পাস করায় কে? ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করায় কে? সায়েন্স পাস করায় কে? বৈজ্ঞানিক করে কে? অফিসার করে কে? কার টাকায়? বাংলার দুঃখী জনগণের টাকায়। একজন ডাক্তার হতে সোয়া লাখ টাকার মতো খরচ পড়ে। একজন ইঞ্জিনিয়ার করতে ১ লাখ সোয়া লাখ টাকার মতো খরচ পড়ে। বাংলার জনগণ গরিব। কিন্তু এরাই ইঞ্জিনিয়ার বানাতে টাকা দেয়, মেডিকেলের টাকা দেয় একটা অংশ। আপনাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা, শিক্ষিত ভাইদের, যে আপনার লেখাপড়ার খরচ দিয়েছে তা শুধু আপনার সংসার দেখার জন্য নয়। শুধু আপনার ছেলেমেয়েদের দেখার জন্য নয়। দিয়েছে তাদের জন্য আপনি কাজ করবেন, তাদের সেবা করবেন বলে। তাদের আপনি কি দিয়েছেন? কি ফেরত দিয়েছেন, কতটুকু দিচ্ছেন? তার টাকায় ইঞ্জিনিয়ার সাহেব, তার টাকায় ডাক্তার সাহেব, তার টাকায় অফিসার, তার টাকায় রাজনীতিবিদ সাহেব, তার টাকায় মেম্বার সাহেব, তার টাকায় সব সাহেব। আপনি দিচ্ছেন কি? কি ফেরত দিচ্ছেন? আত্মসমালোচনা করেন, বক্তৃতা করে লাভ নাই। রাতের অন্ধকারে খবরের কাগজের কাগজ ব্ল্যাকমার্কেটিং করে সকালবেলা বড় বড় কথা লেখার দাম নাই। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে মদ খেয়ে অনেস্টির কথা বলার দাম নাই। আত্মসমালোচনা করুন, আত্মশুদ্ধি করুন; তাহলেই হবেন মানুষ।’

জাতির পিতা বলেন, ‘এই যে কি হয়েছে সমাজের। সমাজ ব্যবস্থায় যেন ঘুণ ধরে গেছে। এই সমাজের প্রতি চরম আঘাত করতে চাই যে আঘাত করেছিলাম পাকিস্তানিদের। সে আঘাত করতে চাই এই ঘুণে ধরা সমাজ ব্যবস্থাকে। আমি আপনাদের সমর্থন চাই। আমি জানি আপনাদের সমর্থন আছে কিন্তু একটা কথা, এই যে নতুন সিস্টেমে যেতে চাচ্ছি আমি, গ্রামে গ্রামে বহুমুখী। কো-অপারেটিভ করা হবে। ভুল করবেন না। আমি আপনাদের জমি নেব। ভয় পাবেন না যে জমি নিয়ে যাব- তা নয়। পাঁচ বছরের প্ল্যান। বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রামে কো-অপারেটিভ হবে। প্রত্যেকটি গ্রামে।’

সেদিনের বক্তৃতায় জাতির পিতা জানান, কো-অপারেটিভে জমির মালিকের জমি থাকবে। তিনি বলেন, ‘ভাই ও বোনেরা আমার! আজকে একটা কথা বলি। আমি জানি শ্রমিক ভাইয়েরা, আপনাদের কষ্ট আছে। এত কষ্ট, আমি ভুলতে পারছি না। বিশেষ করে ফিক্সড ইনকাম গ্রুপের কষ্টের সীমা নাই। কিন্তু কোথা থেকে হবে? টাকা ছাপিয়ে বাড়িয়ে দিলেই তো দেশের মুক্তি হবে না। ইনফ্লেশন হবে। প্রোডাকশন বাড়াতে পারলে তারপরই আপনাদের উন্নতি হবে, না হলে উন্নতি হবে না। আমি জানি। যেমন- আমরা আজকে দেখেছি। কপাল! আমাদের কপাল! আমরা গরিব দেশ তো। আমাদের কপাল আমাদের পাটের দাম নাই। আমার চায়ের দাম নাই। আমরা বেচতে গেলে অল্প পয়সায় আমাদের বিক্রি করতে হয়। আর আমি যখন কিনে আনি-যারা বড় বড় দেশ তারা তাদের জিনিসের দাম অনেক বাড়িয়ে দেয়।’

তিনি বলেন, ‘আমি বুদ্ধিজীবীদের কিছু বলি না। তাদের শুধু সম্মান করি। শুধু এইটুকুই বলি যে, বুদ্ধিটা জনগণের খেদমতে ব্যয় করুন। এর বেশি কিছু বলি না। বাবা, ওদের কিছু বলে কি বিপদে পড়ব। আবার কে কি বই লিখে বসবে। খালি সমালোচনা করলে লাভ হবে না। আমার যুবক ভাইরা, আমি যে কো-অপারেটিভ করতে যাচ্ছি গ্রামে গ্রামে এর ওপর বাংলার মানুষের বাঁচা-মরা নির্ভর করবে। আপনাদের ফুলপ্যান্টটা একটু হাফপ্যান্ট করতে হবে। পাজামা ছেড়ে একটু লুঙ্গি পরতে হবে। আর গ্রামে গ্রামে গিয়ে এই কো-অপারেটিভকে সাফল্যমণ্ডিত করে তোলার জন্য কাজ করে যেতে হবে। যুবক চাই, ছাত্র চাই, সকলকে চাই। আর একটা কথা বলতে চাই, বিচার। বিচার। বাংলাদেশের বিচার ইংরেজ আমলের বিচার। আল্লাহর মর্জি, যদি সিভিল কোর্টে কেস পড়ে সেই মামলা শেষ হতে লাগে প্রায় ২০ বছর। আমি যদি উকিল হই, আমার জামাইকে উকিল বানিয়ে কেস দিয়ে যাই। ঐ মামলার ফয়সালা হয় না। আর যদি ক্রিমিনাল কেস হয়, তিন বা চার বছরের আগে শেষ হয় না। এই বিচার বিভাগকে নতুন করে এমন করতে হবে যে থানায় ট্রাইব্যুনাল করার চেষ্টা করছি এবং সেখানে মানুষ এক বছর বা দেড় বছরের মধ্যে বিচার পাবে-তার বন্দোবস্ত করছি। আশা করি সেটা হবে।’

বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তাই আমি একথা জানতে চাই আপনাদের কাছ থেকে, জানতে চাই। করব, থানা কাউন্সিল করব, ডিসট্রিক্ট কাউন্সিল হবে, আর আমি যে একটি কথা- এই যে চারটি প্রোগ্রাম দিলাম, এই যে আমি কো-অপারেটিভ। আপনাদের কাছ থেকে দ্বিগুণ ফসল চেয়েছি, জমিতে যে ফসল হয় তার ডবল, কল-কারখানায় কাজ-সরকারি কর্মচারী ভাইরা একটু ইনডিসিপ্লিনে এসে অফিসে যান, কাজ করেন। আপনাদের কষ্ট আছে, আমি জানি। দুঃখী মানুষ আপনারা। আপনারা কাজ করেন। যাদের পেটে খাবার নাই তাদের ওপর ট্যাক্স বসিয়ে আমি আপনাদের পোষতে পারব না। প্রোডাকশন বাড়লে আপনাদেরও এদের সঙ্গে উন্নতি হবে। এই যে কথাগুলো বললাম আপনারা আমাকে সমর্থন করেন কিনা, আমার ওপর আপনাদের আস্থা আছে কিনা, আমাকে দুই হাত তুলে দেখিয়ে দিন।’

সবশেষ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ভাইয়েরা, আবার দেখা হবে, কি বলেন? ইনশাআল্লাহ আবার দেখা হবে। আপনারা বহুদূর থেকে কষ্ট করে এসেছেন। গ্রামে গ্রামে ফিরে যান। যেয়ে বলবেন দুর্নীতিবাজদের খতম করতে হবে। ক্ষেতে-খামারে কল-কারখানায় প্রোডাকশন বাড়াতে হবে। সরকারি কর্মচারী ভাইরা, আপনারাও কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের সদস্য হবেন। আপনারা প্রাণ দিয়ে কাজ করুন। ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ এসেছে, বাংলাদেশ থাকবে। আপনারা স্লোগান দিন আমার সঙ্গে, জয় বাংলা। বিদায় নিচ্ছি। খোদা হাফেজ।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here